পৃষ্ঠাসমূহ

যে দেশে তিন লক্ষ ষাট হাজার বাড়িতে বাঙ্কার তৈরি করা আছে পারমাণবিক বোমা থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো

সুইজারল্যান্ডের বাংকার নেটওয়ার্ক: পারমাণবিক সুরক্ষা ও  একটি জাতির প্রস্তুতি

PIC archive.roar.media/


সুইজারল্যান্ডের সুবিশাল বাংকার নেটওয়ার্ক কোনো আকস্মিক উদ্যোগ নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা তাদের "সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা" (total defense) নীতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে শীতল যুদ্ধের (Cold War) সময়কালে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কায় এই বাংকার নির্মাণ কর্মসূচি এক নতুন মাত্রা পায়।

১. কখন তৈরি হলো: ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও সময়কাল

সুইজারল্যান্ডের বাংকার নির্মাণের ধারণা ও বাস্তবায়ন বেশ দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে, তবে এর মূল বিস্তার ঘটেছে ২০শ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত:

  • প্রাথমিক পর্যায় (১৯শ শতকের শেষ থেকে ২য় বিশ্বযুদ্ধের আগে): সুইজারল্যান্ডের প্রথম দিকের সামরিক বাংকারগুলো তৈরি হয় ১৮৮৬ সালের দিকে, যখন গটহার্ড রেলওয়ে খোলা হয়। প্রাথমিকভাবে, এগুলি ছিল দেশের দুর্গম পর্বতমালায় তৈরি সামরিক দুর্গ, যা সম্ভাব্য আক্রমণকারীদের প্রবেশাধিকার রোধ করতে ডিজাইন করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এবং এর সময় (১৯৪০-এর দশক) "সুইস ন্যাশনাল রিডাউট" (Swiss National Redoubt) পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আল্পস পর্বতমালার গভীরে বিশাল সামরিক দুর্গ এবং বাংকার তৈরি করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যদি দেশ আক্রান্ত হয়, তবে সেনাবাহিনী এবং সরকারের একটি অংশ এই সুরক্ষিত স্থানে আশ্রয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

  • শীতল যুদ্ধের যুগ (১৯৫০-১৯৮০-এর দশক): মূল নির্মাণ পর্যায়

    • পারমাণবিক হুমকির প্রতিক্রিয়া: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রের উত্থান এবং শীতল যুদ্ধের সময়কার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা সুইজারল্যান্ডকে তাদের প্রতিরক্ষা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। তারা বুঝতে পারে যে, নিরপেক্ষতা তাদেরকে সরাসরি যুদ্ধ থেকে হয়তো রক্ষা করবে, কিন্তু পারমাণবিক হামলা বা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরিণতি থেকে রক্ষা করবে না।

    • ১৯৬৩ সালের আইন: এই হুমকি মোকাবেলা করার জন্য ১৯৬৩ সালে সুইজারল্যান্ড একটি যুগান্তকারী আইন পাস করে। এই আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নতুন নির্মিত বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে পারমাণবিক হামলা প্রতিরোধী আশ্রয়কেন্দ্র (bomb shelters) থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি সুইস নাগরিকের জন্য একটি সুরক্ষিত আশ্রয়কেন্দ্রের জায়গা নিশ্চিত করা। এই সময়েই বাংকার নির্মাণ কার্যক্রম সবচেয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করে।

    • সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ: পরবর্তী দশকগুলোতে এই আইন বলবৎ থাকে এবং বিদ্যমান ভবনগুলোতেও বাংকার যোগ করার বা আধুনিকীকরণের কাজ চলতে থাকে।

  • শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময় (১৯৯০-এর দশক থেকে বর্তমান): শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বাংকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক শুরু হয়। অনেক সামরিক বাংকারকে অচল ঘোষণা করা হয় এবং কিছু বিক্রি করে দেওয়া হয় বা বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা হয় (যেমন: ডেটা সেন্টার, ওয়াইন সেলার, যাদুঘর)। তবে, ব্যক্তিগত আশ্রয়কেন্দ্রের আইনটি এখনও কার্যকর রয়েছে, যদিও এর কঠোরতা কিছুটা কমানো হয়েছে এবং নতুন নির্মাণের ক্ষেত্রে এটি সবসময় কঠোরভাবে প্রয়োগ হয় না।

২. কীভাবে তৈরি হলো: প্রক্রিয়া ও নকশা

এই বিশাল বাংকার নেটওয়ার্ক তৈরি করা ছিল একটি অসাধারণ প্রকৌশলগত এবং লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ:

  • দুটি প্রধান প্রকার:

    1. সামরিক বাংকার (Military Bunkers): এগুলি আল্পস পর্বতমালার গভীরে, পাহাড়ের ভেতরে তৈরি করা হয়েছিল। এগুলি ছিল সুরক্ষিত দুর্গ, যেখানে কামান, মেশিনগান, সৈন্যদের থাকার জায়গা, হাসপাতাল, জ্বালানি সরবরাহ এবং কয়েক মাস টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু মজুত থাকত। এগুলির প্রবেশপথগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ছদ্মবেশী করা হতো, যাতে বাইরে থেকে তাদের উপস্থিতি বোঝা না যায়।

    2. বেসামরিক আশ্রয়কেন্দ্র (Civilian Shelters): এগুলি মূলত প্রতিটি বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, স্কুল এবং হাসপাতালের নিচে বা কাছাকাছি তৈরি করা হতো। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলি পারমাণবিক বিস্ফোরণের চাপ (blast pressure), তেজস্ক্রিয় বিকিরণ (radioactive fallout), রাসায়নিক এবং জৈবিক হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে ডিজাইন করা হয়েছিল।

  • নির্মাণ প্রক্রিয়া:

    • সুরক্ষিত নকশা: বাংকারগুলোর দেয়াল শক্তিশালী রিইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে তৈরি করা হতো, যার পুরুত্ব সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার বা তারও বেশি হতো। দরজাগুলোও ছিল অত্যন্ত পুরু স্টিলের তৈরি।

    • NBC ফিল্টার সিস্টেম: প্রতিটি বাংকারে নিউক্লিয়ার, বায়োলজিক্যাল, কেমিক্যাল (NBC) ফিল্টারেশন সিস্টেম থাকত, যা বাইরের দূষিত বাতাসকে পরিশোধন করে ভেতরে বিশুদ্ধ বাতাস সরবরাহ করত।

Pic-www.britannica.com
    • স্বয়ংসম্পূর্ণতা: বেশিরভাগ বাংকারে নিজস্ব পানি, খাদ্য, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের (যেমন ডিজেল জেনারেটর) ব্যবস্থা থাকত, যাতে বাইরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও কয়েক দিন বা এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত টিকে থাকা যায়।

    • ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো: এই বাংকারগুলোর সাথে প্রায়শই সুড়ঙ্গ, গোপন পথ এবং জরুরি নির্গমন পথ যুক্ত থাকত। সামরিক বাংকারগুলো পুরো পর্বতমালা জুড়ে টানেলের বিশাল নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

    • খরচ ও শ্রম: এই বিশাল আকারের নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রচুর অর্থ ও শ্রমের প্রয়োজন হয়েছিল। এটি ছিল একটি জাতীয় প্রচেষ্টা যেখানে সরকার, সেনাবাহিনী এবং বেসরকারী নির্মাণ সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে।

৩. কত পরিমাণে তৈরি হলো: ধারণক্ষমতা ও পরিসংখ্যান

সুইজারল্যান্ডের বাংকার নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি সত্যিই অভাবনীয়:

  • সংখ্যা: সুনির্দিষ্ট সংখ্যা আংশিকভাবে গোপন রাখা হলেও, বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন যে:

    • দেশটিতে প্রায় ৩৭০,০০০ (তিন লক্ষ সত্তর হাজার) বেসামরিক আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৬০,০০০টি ব্যক্তিগত বাড়িতে এবং প্রায় ৯,০০০টি সর্বসাধারণের জন্য ব্যবহৃত বাংকার (যেমন স্কুল, হাসপাতাল, কমিউনিটি বিল্ডিংয়ের নিচে)।

    • এছাড়া, আল্পস পর্বতমালার গভীরে প্রায় ৮,০০০ সামরিক বাংকার রয়েছে, যার সঠিক অবস্থান এবং কার্যকারিতা গোপন রাখা হয়।

  • ধারণক্ষমতা: সুইজারল্যান্ডের বাংকারগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। সরকারি তথ্যানুযায়ী, এই বাংকারগুলো ৮.৭ মিলিয়ন (৮৭ লক্ষ) এরও বেশি মানুষকে আশ্রয় দিতে সক্ষম। যেহেতু সুইজারল্যান্ডের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৮.৮ মিলিয়ন, এর অর্থ হলো তাত্ত্বিকভাবে প্রতিটি সুইস নাগরিকের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা আছে, এবং অতিরিক্ত কিছু জায়গাও রয়েছে।

  • বৈশ্বিক তুলনামূলক চিত্র: বিশ্বের অন্য কোনো দেশে সুইজারল্যান্ডের মতো এমন বিস্তৃত এবং জনসংখ্যর চেয়ে বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বাংকার নেটওয়ার্ক নেই। এমনকি ইসরায়েলের মতো দেশ, যা তার বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য পরিচিত, তারাও মাথাপিছু আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণক্ষমতার দিক থেকে সুইজারল্যান্ডের ধারেকাছেও নেই।

উপসংহার

সুইজারল্যান্ডের এই বিস্তৃত বাংকার নেটওয়ার্ক কেবল পারমাণবিক হামলার ভয় থেকে জন্ম নেয়নি, বরং এটি দেশটির শতাব্দীব্যাপী আত্মনির্ভরশীলতা, সতর্কতা এবং নিরপেক্ষতার সংস্কৃতির একটি প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে, একটি ছোট দেশ কীভাবে দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সুসংগঠিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, এমনকি সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক হুমকির মুখেও। আপনার ব্লগ পোস্টের জন্য এটি সত্যিই একটি দারুণ বিষয় যা মানুষকে মুগ্ধ করবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন